দিদার  বাড়ি ।

আমার দিদার বাড়ির গ্রিল এর গেট দিয়ে ঢুকলেই মনে হতো যেনো ছোটবেলায় ফিরে গেছি । সেই ছোটোবেলা থেকে  দিদার বাড়ি ঠিক এক রকম।  জানিনা, দিদা কিছু পাল্টাতে চাইত না কেনো। আজকাল  তো কত সহজেই  নতুন  জিনিস কেনা যায়। আমি অনেক বার করে বললে দিদার ওই এক কথা, ”এই বেশ আছি , এগুলির সাথে আমার অনেক  দিনের  ভাব, অনেক স্মৃতি, সে তুই  বুঝবি না রে দিদিভাই । ”  আমি রাগ করতাম।  অভিমান করে বলতাম “বুঝতেও চাই না, তোমার  বাড়িতে কোনো দিন কিছু পাল্টাতে হবে না তোমাকে ।” সব আসবাব গুলো কেমন যেনো ধূসর রঙের, মনে হত কত যুগের ধুলো জমে আছে যেন । কিন্ত ওই ধূসর আসবাব এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল একটি খাট।  বেশ রাজা রাজা ভাব নিয়ে দিদার শোবার ঘর জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকত  দিদার বিয়ের মস্ত খাট । একদম antique জিনিস, কালো কাঠের ঝকঝকে পালিশ, একবার  দেখলেই নজর কাড়ে । সেই খাটে চড়তে ছোট বেলায় আমার একটা পা দানি লাগত। তবে খাট  থেকে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল না মনে। ধপধপে সাদা চাদরে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আমি মনে করতাম যেন মস্ত জাহাজে চেপে আমি সাত সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছি।

এই সব পুরনো জিনিস এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকত আমার ছেলে বেলা। সব হারিয়ে যাওয়া জিনিষ গুলো, যাদের স্মৃতি আর হয়তো আমারো মনে নেই, ঠিক পাওয়া যেত দিদার বাড়িতে । দিদার fridge এর ওপর আমার ছোটবেলার ছবি, কেমন বোকা বোকা মুখের হাসি সেই ছবিতে। আমার বয়েস আট কি নয়, কপাল জোড়া fringe  কাট চুল আর হলুদ লেস এর ফ্রক। বেশ কয়েকবার  দিদার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ওই fridge এর মাথার ছবি টা পাল্টায় না কেনো, আমার কোনো অন্য ছবি বা বড় বেলার ছবি তো সাজাতে পারে ।আমার সকল প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যেত দিদা । এক গাল হাসি মুখে মাখিয়ে বলতো, “হ্যাঁ হ্যাঁ, সব ঠিক পাল্টে দেবো একদিন, সেদিন তুই এসে দেখে যাস দিদিভাই ।” কথাটা বলত ঠিকই কিন্ত যতবার ফিরে আসতাম সব কিছু ঠিক আগের মতন পেতাম। একটা কাঁচের শো কেস থাকত বসবার ঘরে, সেই শো কেস এর ভিতরে সাজানো থাকত আমার পরিত্যক্ত সব খেলনা,  হাত পা ভাঙা পুতুল, চুল হীন barbie doll, চাকা হীন মোটর গাড়ি, রান্না বাটির  চায়ের সেট, আরো কত কি। আমার হাতে আঁকা drawing খাতার পাতায় ‘Happy Birthday দিদা’ লেখা কিছু card  হলুদ হয়ে নত মস্তক , তবু ফেলা চলবে না।

আমি জানতাম  দিদা তার মেয়ের চেয়ে বেশি আমাকে ভালবাসে, দিদার জীবনের মধ্য মণি আমি ।ছোটবেলার গরমের  ছুটি গুলো মনে পরে। তখন আমরা এক মাস টানা দিদার কাছে থাকলাম, কী খুশি টাই না হত দিদা। দিদার রান্না ঘরের তাকে থরে থরে সাজানো বয়াম, তাতে কত রকমের আচার, সারা দুপুর চেটে চেটে ঐ আচার খাওয়ার স্মৃতি ভুলতে পারি না। লাল মেঝের লম্বা বারান্দায় আসন পেতে বসে , দিদার  হাতের বাসন্তী পোলাও , মাংস আর পায়েস। কাঁসার থালা, গাওয়া ঘি এর গন্ধ, লাল মেঝে, সব টা জুড়ে স্মৃতির এক অদ্ভুত টান। এই টান বেঁধে রাখে  আমায় আমার ছোটবেলার ‘আমি’ তে ।

আমার America চলে যাবার দিন দিদা খুব কেঁদে ছিল। কাঁদতে কাঁদতে প্রশ্ন করেছিলো “তুই আর দেশে ফিরবি না দিদি ভাই ?” প্রতিশ্রুতি  দিয়েছিলাম, “ফিরতে তো আমাকে হবেই দিদা, পড়াশোনা শেষ করে ফিরে আসবো। ” তারপর তো আরো কতো বছর কেটে গেল, পড়াশোনা শেষ করলাম, বিক্রম এর সাথে প্রেম করে বিয়ে করলাম, তারপর আমার চাকরি, বিক্রম এর PhD, বছর গড়াতে লাগলো। আমার পুতুল খেলার ঘর পরে রইল পিছনে । আমি নতুন করে ঘর বাঁধলাম মনের মানুষের সঙ্গে সুদূর বিদেশে । জানতেও পারলাম না, আমার পুতুল  খেলার ঘর আগলে বসে থাকে একজন, আমার প্রতীক্ষায় । সেই  আমার ছোটবেলার ঘর, যেখানে আমার অপেক্ষা হয়, যে ঘরে আমি ঢুকলে  ঝল মল আলো জ্বলে ওঠে ।

আমার ছেলে বিহান হওয়ার পর, বেশ কয়েক বার ঘন ঘন কলকাতায় ফিরে ফিরে এসেছি।  বিহান কে আমার ছোটবেলা টা চেনাতে। জানিনা কেন এই তাগিদ । বিহানকে সব কিছুর সাথে পরিচিত করাবার অদ্ভূত এক তাগিদ । প্রত্যেক বার ছুটে গেছি আমার দিদার বাড়ি। প্রত্যেক বার খুঁজে পেয়েছি কিছুটা হারানো শৈশব। বিহান কে যে বার  দিদা প্রথম দেখল, আলমারি থেকে বার করে দিল আমার ছোট বেলার হাতের রুপোর বালা, আর লাল টুক টুকে একটা হাতে বোনা সোয়েটার, আমার  সোয়েটার । বলেছিলো, “ওকে পরিও, ওর জন্য তুলে রেখেছিলাম এত দিন।” আমার বয়েস যত বেড়েছে তত অনুভব করতে শিখেছি , বুঝতে শিখেছি, স্মৃতি  দিদার  অমূল্য সম্পদ, ভালোবাসায় ভরপুর সেই স্মৃতি ।মন টানলেও দেশে যাওয়া ক্রমে কমে আসছিল । আমি আমার নিজের হাতে তৈরি  মায়া জালে বাঁধা পরে যাচ্ছিলাম, একটু একটু করে, ঠিক দিদার মতন, ঠিক মায়ের মতন ।

এবার আমি কলকাতা এসেছি, মার ফোন পেয়ে । মা ফোনে বলেছে, দিদার শরীর  ভাল নেই, আমার কথা খুব বলে, আমি যদি পারি যেন একবার আসি। ছুটির ব্যাবস্থা করে , এলাম কলকাতা । Airport থেকে সোজা দিদার বাড়ি। ওই চির পরিচিত গ্রিল এর গেট টা খুলে , সেই হারিয়ে যাওয়া ছোট মেয়ের মত আমি প্রায় দৌড়ে ঢুকলাম দিদার ঘরে। ঢুকেই  চমকে উঠলাম, Fridge  এর ওপর আমার  সেই ছোট বেলার ছবি, আর ঠিক তার পাশের দেওয়ালে জ্বল জ্বল করছে দিদার হাসি মুখের মস্ত এক ছবি, দিদার সেই হাসি মুখের ছবিতে একটা সাদা ফুলের মালা । স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হল ছবি থেকে দিদা হাসি মুখে বলছে, “কি দিদি ভাই, দিদার বাড়ি এবার পাল্টালো তো ? বলেছিলাম সব পাল্টে দেব সময় এলে, কেমন লাগছে বল ! ” আমি অঝোর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলাম ” পেরেছ , পুরোটাই পাল্টে ফেলতে পেরেছ দিদা । তুমি সঙ্গে করে আমার ছোটবেলার দুনিয়ার চাবি কাঠিটা  নিয়ে গেছো , সারা জীবনের মতন । বেশ করেছ, আর আমার ছোট থেকে কাজ নেই। “

সকল কাজ সেরে দিদার বাড়ির  গ্রিল এর গেটে  তালা লাগালাম আমি নিজের  হাতে। তালা লাগালাম আমার ছোটবেলার বাড়িতে।  দিদার বাড়ি অবশেষে পাল্টে গেল চির তরে। আমার হাতে কেন জানি রয়ে গেল একটা ছবি, দিদার প্রিয় ছবি, আমার fringe কাট চুলের ছোটবেলা ।

10 thoughts on “দিদার  বাড়ি ।

  1. Why do these memories hurt us so much? 😔 I could relate word by word , the door grill was green in my Mashi’s house. She was like our dida. Is it that we can’t hv our childhood carefree days back, or loss of these dear people in our lives, these relationships. I cried a lot Buban after reading this wonderful write up. Your every word touches the core of our being. BEAUTIFUL 😍

    Liked by 1 person

  2. Exceptionally talented girl you are, Sangeeta! The story touched the core of my heart and I could relate so well with scenario you have depicted. My summer vacations were often spent in my mom’s baaper badi. But unfortunately she had lost both her mother and her illustrious father as a teenager, so we visited our mama badi. A huge bungalow with two enormous mounted skin of tigers (my Dadu’s shikaar) in the humongous drawing room, which used to scare us and fascinate us no end. The whole family sitting for meals and the stories of dadu in his heydays told by my Mama and Mashi. Those were precious childhood years which are remembered with such fondness by us cousins whenever we are together.

    Liked by 1 person

    • Shikha dear, I feel completely rewarded when my writing evokes so many emotions amongst my readers. Loved to read about your Mama r bari. So many stories hidden in pockets, retelling them keeps memories alive . Thank you for appreciating. 🙏❤️

      Like

Leave a reply to sangeeta_chakladar Cancel reply