“সারা রাত দুই চোখের পাতা এক করতে পারিনাই”, এই কথাটা ছোটবেলায় প্রাই শুনতাম আমার দিদিমার মুখে । শুনলেই মনে হতো ‘বুড়ো মানুষ রা এমনি কথা কেনো বলে, এমন টাও হয় নাকি, নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলছে ।’ দিন কেটেছে, সেই দিদিমাও আর নেই, মাও আর নেই, তাই তাদের গিয়ে বলতে পারি না ‘হয় গো হয়, ঠিক এরকম টা হয় ‘। আমি যে এখন অনেক রাত ওই দুই চোখের পাতা এক না করে কাটাই, এখন আমি বুঝি । দিদিমা না হতে পারি কিন্তু দিদিমা হওয়ার বয়েস টা তো হয়েছে, তাই এই ব্যামো টাও অল্প অল্প শুরু হয়েছে ।
গত শনিবার পুরো রাত রাতের পাখির মতোন ড্যাব ড্যাব করে জেগে থাকলাম। সকাল হতেই in house golfer কে বললাম, ‘আজ তোমার golf যাওয়া চলবে না। আমাকে গাড়ি করে ড্রাইভ এ নিয়ে যেতে হবে, তারপর কোথাও ইচ্ছে হলে গাড়ি থেকে নেমে, আমরা হাঁটব, তারপর কচুরি- তরকারি ,জিলিপি আর চা at Sharma Tea’। কেবল morning walk বললে কাজ হত কিনা জানিনা, কিন্তু ওই কচুরি জিলিপির টোপ টা কাজ করলো । তিনি একটু দোনা মনা করে রাজি হয়ে গেলেন । বেশ কিছু ক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে আমি বললাম ‘এবার গাড়ি থামানো হক, এখানে অনেক গাছ, আমরা একটু হাঁটি চলো’।
চালক গাড়ি থামালেন, আগে পিছনে করে নিপুণ ভাবে পার্ক করলেন। অধৈর্য আমি গাড়ির দরজা খুলে নেমে দাঁড়ালাম, আমার ভাবটা এমন যেন ওনার কারণে সিনেমার শো মিস হয়ে যাবে। চোখের সামনে সারি সারি পলাশ গাছ তখন আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে, মন বলছে দে ছুট। আমার একটা বড় দোষ আছে, আমি যখন হাঁটি হন হন করে প্রায় দৌড়বার মতন করে হাঁটি, তাই আমার সাথে কেউ হাঁটতে চায় না। দেখে মনে হতেই পারে মহিলা বাস ধরার জন্যে দৌড় দিচ্ছেন। জোরে হাঁটি বটে, কিন্তু আমার মন কবি কবি ভাব নিয়ে প্রকৃতির ধীর গতিতে চলার আনন্দের মধ্যে ডুবতে থাকে । কত কিছু দেখার থাকে চারি পাশে। মনে মনে হারিয়ে যেতে যেতে আমি গুন গুন করে গেয়ে উঠি , ” রূপ সাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ রতন আশা করি ।” আমার পাশের মানুষ দু চার কদম পিছন পিছন আসতে থাকেন, তিনি আমার এই sprint walking style এর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন বহুকাল আগে ।
আমি অবাক চোখে দেখি , পলাশ গাছের আগুন জলা রূপ, তার উল্টো দিকে গোলাপি সাদার গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলে ভরা মাধবীলতার সারি , হলুদ রঙের কলকে ফুলের ভারে নুয়ে পরা ডাল, আরো কত ফুল, যেন কেউ অতি যত্নে সাজি সাজিয়ে অপেক্ষা করছে আমার। কলকে ফুল গুলো আমার গালে হালকা করে টোকা দিয়ে যায় যেনো । চলার পথের ধারে কত রঙের বাহার, চারিপাশে ছড়িয়ে পরে আছে অগুন্তি পলাশ। মনে হয় আমার ওপর তাদের বড্ড অভিমান হয়েছে, এত দিন আসি নি বলে ।তাদের উজ্জ্বল কমলা বর্ণের ফুল গুলো মাটিতে পরে ধুলো মাখা মাখি করে জানান দিচ্ছে আমাদের চলে যাবার দিন এসে গেছ, বসন্ত চলে গেছে, তুমি আসতে দেরী করে ফেলেছ । মন টা কেমন যেন উদাস হয়ে ওঠে আর ভাবে ‘ইশ, আর কয়েকদিন আগে এলাম না কেনো ।’ আর ঠিক তখনই, যেন আমার মনের কথা বুঝে নিয়ে , মাটিতে পরে থাকা এক bougainvillea র ডাল আমায় ডাক দিয়ে, ফিক করে হেসে বলে, ”ওমন মন খারাপ করিস না, আমাদের দিকে চেয়ে দেখ, কত রঙে সারা বছর তোর পাশেই তো থাকি আমরা ,পাঁচিল এর গা বেয়ে উঠে তোকে দেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকি !” আরে তাই তো, এই Kagaz ke phul ( যাকে আমি মজা করে বউ gone বলে ডাকি) ও তো আমার বড় আদরের। মায়ার টানের টানাপোড়েন , তার কি কোনো হিসাব আছে। আমায় টানে আকাশ, আকাশের চাঁদ, তারা, সূর্য ; আমায় টানে সমুদ্র, নদী, রঙের খেলা ; আমায় পাগল করে সবুজের নেশা, তবে কেনো পলাশ পলাশ করে কেঁদে মরি আজ। পলাশ যেনো কোন পুরনো প্রেমিক, যার সাথে রয়ে গেছে কিছু না বলা কথা, তাই তো সে তার বুক ভরা অভিমান নিয়ে টুপ টুপ করে ঝড়ে পড়ছে।
হাঁটার পথের এক পাশে খোলা সবুজ মাঠ , লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা সেই মাঠ । সেখানে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়, এত ভোরে সেই টিকিট ঘর খোলেনা, তাই মানুষ জনও আসে না। ওই গেটের মধ্যেই সবুজ মাঠের ওপারে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে seven wonders of the world, ভোরের আলোয় ঝকঝক করছে , ছোট্ট এক পৃথিবী । আমার সেখানে যাওয়া হয় নি কোনোদিন। আমি যে wonders of the world বড় সহজে পেয়ে যাই আমার চার পাশে । এই ঝড়ে পরা অভিমানী পলাশ এর বুকে , কলকে ফুলের নরম ঠোঁটের আদরে , আর মন মাতানো মাধবী লতার গন্ধে, এর মধ্যেই আমার শহর,আমার পৃথিবী, আর এক রাশ ভালবাসা ।
গরম আসছে, সঙ্গে করে আনবে ঝুড়ি ভরা কৃষ্ণ চূড়ায় মাতোয়ারা নীল আকাশ ; অমলতাস এর পাগল করা হলুদ ডালের হাত ছানি ; আধ ফোটা বেলি ফুলের মালা ; আর জুঁই – জাগা রাত । এই রে, কথায় কথায় আবার রাত জাগার কথা ওঠে কেনো আমার মনে । বেশ তো হারিয়ে যাচ্ছিলাম মনে মনে। আমার মগ্নতার জগত থেকে ফেরাতেই বোধহয় পিছন থেকে golfer ডাক দিলেন, ” এবার কি ফিরবে?” বুঝলাম অনেকটা পথ এসে গেছি উদাসী মনে হাঁটতে হাঁটতে। জোরে হাঁটি বলে অনেক টা বেশি হাঁটা হয়ে যায়। ‘হ্যাঁ চলো, এবার ফেরা যাক’ বলে about turn করি আমি । ফেরার পথে এক মুঠো পলাশ কুড়িয়ে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারি না , তাদের দিকে আরো কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার লোভ । গাড়ি তে উঠেই মনে পড়ে যায় , কচুরি-তরকারি আর জিলিপির প্রতিশ্রুতি, মনে হল golfer এর মুখে দেখলাম এক টুকরো হাসি ।মন টা বড় শান্ত হয়ে গেছিল। রাত জাগার ক্লান্তি আমায় কষ্ট দেয় না, রাত জাগা এই আমি ফোন খুলে গান চালিয়ে দি :
“আমার ভিনদেশী তারা…তোমার আকাশ ছোঁয়া বাড়ি
আমি পাইনা ছুঁতে তোমায়, আমার একলা লাগে ভারী।”


Akhon rat 1_40, ghum aschena,pore fellam akmutho Palash,khub bhalo laglo,amio Jodi sangi hotam! Likhe jao
LikeLiked by 1 person
Thank you Pishimoni.💕💕
LikeLike
Ek mutho Palash. Just too good !!
LikeLiked by 1 person
Thank youuu. Palash gone, Krishnochuraye gacher matha komola jholmol.
LikeLike