আমি : বলি ও নলেন, নলেন রে, পৌষ মাস তো চলতে বসলো, তুই কি এই বচ্ছর আর আমার ঘরে আসবি না ?
নলেন: আমার এখন অনেক ডিমান্ড। ওই তোমার মতন যারা আমায় কফি র বোতলে বন্ধ করে রাখে , আর গুড় রুটি খায় , আমি তাদের বাড়ি যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। আমার সময় কম।
আমি: তাহলে কি করতে হবে বল, তোকে ঘরে না আনলে যে মন বড় কষ্ট পায়। আর লোক জন ও তো ছি ছি করবে।
নলেন : আমায় ঘরে আনা অনেক খাটনির কাজ ।যুত করে পিঠে পুলি বানাতে পারবি ? দূধ পুলি, গোকুল পিঠে, পাটিসাপটা, পায়েস, আরো কত কি না মানুষ জানে। আরো আছে, আমায় আজকাল এক্সপোর্ট করা হয় বিদেশে। আমার অনেক কদর। তুই কি বানাবি বল, এত দিনের চেনা , তাই একটু ভাবছি।
আমি: অত তো আমি পারবো না রে নলেন। তারপর গুড় গুড় মন করলে রক্ত ও নাকি গুর গুর করে শুনেছি। তাই দুটো পদ অন্তত রাঁধবো, কথা দিলাম। আর সুন্দর করে তোর ছবি তুলে সকল কে দেখাবো।
নলেন: তোর চেয়ে ঢের বেশি ভালো ছবি তোলার লোক আমার আছে রে আছে। তাও তুই যখন এত করে বলছিস, তবে চল চলি তোর ঘরে।
আমি: ও নলেন, ও নলেন, বড় আনন্দ দিলি বাবা । বেঁচে থাক তুই রসে রসে টই টম্বুর হয়ে। ফিরে আয় আমাদের ঘরে বচ্ছর বচ্ছর। পিঠে পুলি তে , নতুন গুরের গন্ধে ভরে উঠুক বাঙালির প্রাণ।
আমার ছোট জা বললো “দিদি কালো জিরে কাঁচা লঙ্কার লেখা তো হল, এবার সরষে পোসতো নিয়ে লেখো দেখি”। শোনো মেয়ের কথা, আচ্ছা এমনি আব্দার কেউ করে যা রাখা দায়। সত্যি এর চেয়ে ঢের সোজা হতো যদি সে সরষে বাটা দিয়ে ইলিশের আব্দার করত। লেখা কি sunrise এর গুঁড়ো মশলার প্যাকেট, যার যখন ইচ্ছে প্যাকেট এর মুখ কাঁচি দিয়ে কাটবে আর ঝুর ঝুর করে লেখার গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়বে। বন্ধু বান্ধব না হয় ভালোবেসে প্রথম কালো জিরে কাঁচা লঙ্কার ফোড়নে কিছু হাত তালি দিয়ে ফেলেছে, তাই বলে তাদের ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে সোজা সরষে পোসতোর গল্প, তাও কি সম্ভব! লেখা ঝাঁজ হয়ে যাবার ভয় আছে, তেতো হয়ে যাবার ভয় আছ, মোট কথা হল এই যে এমন লেখার অনেক রিস্ক। টক ,ঝাল, মিষ্টি হলে তবু একটা কথা ছিল, চাটনীর মত চট চটে একটা প্রেম কাহিনী লেখার চেষ্টা করতাম। পিঠে পুলির শীতে, নলেন গুড়ের রসে জবজবে একটা লেখা লিখতে মন চাইছে, কিন্তু লিখতে বসেছি সরষে পোসতোর গল্প। ঘটি,বাঙালের গল্প নয়,গল্প হবে নর ও নারীর , একটু ঝাঁজে, একটু লাজে, চেষ্টা করি সরষে পোসতোর গল্প বলার।
সরষে পোসতো হোক কিম্বা জীবন, যতক্ষণ না শিল আর নোড়ার চাপে পিষছে রঙ, রস, গন্ধ ,স্বাদ কোনটাই প্রকাশ পায় না । পিষতে পিষতে ধীরে ধীরে মিশে যায় তাদের একান্ত নিজস্ব পরিচিতি, হয়ত বা নিজের অজান্তেই একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে সরষে আর পোসতো । আমার এই আকাশ কুসুম গল্পের খাতিরে সরষে না হয় হোক নর আর পোসতো হোক নারী , ঠিক যেন রান্নাঘরের “হৃদয়ের একুল ওকুল”। আর এদের যুগল বন্দি হয়ে উঠুক আমার রসনার রচনা ।
ঝাঁজ সরষে যেন কড়া মেজাজের পুরুষ, সারাক্ষণ বেশ একটা রাগ রাগ অহংকারী হাব ভাব। কাঁচা হলুদ রঙের সরষে ক্ষেতের উচ্ছল যৌবনের নাচ দেখল মন টা কেমন DDLJ হয়ে ওঠে আজও । আর হবে নাই বা কেন, দিল তো পোসতো হ্যায় জী, দিল কি মানবে কড়া শাসনের “প্রেমে পরা বারন”; নাঃ ,সরষের আকর্ষণ এ পোসতো সাড়া দেবেই। কিন্তু ঐ কাঁচা হলুদ সরষের ফসল দেখে বোঝা যায় না যে এই হলুদ রঙের ঝাঁকড়া চুলের যুবক আগামী দিনে হয়ে উঠবে সরিষার তৈল, ঝাঁজে আর গুণে অতুলনীয়। তবু কেন জানি পুরুষ কে দেখলেই আমার মনে হয় তাদের জীবন অনেকটা কাসুনদির বোতলের মধ্যে বন্দি দশা, ঢাকনা খুলতেই ঝাঁজ বেরিয়ে পরে। এদের মাথার ছিপি বন্ধ রেখে ঠান্ডা ঘরে রাখাই শ্রেয়, তাতে ঝাঁজ ও স্বাদ দুই ভাল থাকে! বাঙালি হওয়ার সুবাদে আমার অবাঙালি বন্ধুরা আমার কাছে সরষে বাটা দিয়ে মাছ খেতে চেয়েছেন বহুবার। প্রত্যেক বার রাঁধতে গিয়ে তেতো হয়ে যাবার ভয়ে ভয়ে থেকেছি। আমার আবার একটি দোষ আছে, ভালোবাসতে গেলেই বোকামি করে মাত্রা জ্ঞান হারিয়ে ফেলি, তা সে সরষে হোক বা পুরুষ। অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছি, সরষে পোসতো কে এক করে রান্না করলে স্বাদের বাহার যায় বেড়ে আর রান্না করাও হয়ে ওঠে অনেক বেশি সহজ ।
মনের চোখ দিয়ে দেখলে পোসতোর সঙ্গে আমাদের মেয়েদের বেশ একটা মিল পাই আমি । প্রেয়সীর মতন মনের কোনে কবে কখন ঘর করে নেবে বোঝা যাবেনা। কিন্ত একবার তাকে ভালবেসে ফেললে মন নেশায় ডুবতে ডুবতে গেয়ে উঠবে, “নেশা লাগিল রে, নেশা লাগিল রে বাঁকা দু নয়নে নেশা লাগিল রে” । নারী আর পোসতোর প্রেম ও প্রকৃতি নিরীহ গোছের, বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, সাদামাটা ভাব, কিন্তু অন্তরে প্রেমের সাগর লুকানো । সাদামাটা মন, সহজেই মিল মিশ খায়, আর নিজেই নিজের মূল্য বোঝে না। একটু সৌখিন, একটু আদুরে পোসতো বাটা যখন গিয়ে মেশে মুরগির ঝোল বা দেশী আলু ঝিঙের তরকারিতে, তখন ঘরোয়া রান্না ও হয়ে ওঠে পার্টি ফুড !
এমন সাদামাটা পোসতো আমাকেও (যে কিনা তার সম গোত্রের) কম বোকা বানায়নি । যখন আমার প্রথম সংসার করতে পথে নামা তেমন সময় একদিন আমায় জানানো হল যে আমার জীবন সঙ্গী মানুষটি পোসতো ভাজা খেতে খুব ভালবাসেন । তার এই ভালবাসায় আমার কি রোল সেটা বুঝতে আমার বেশ কিছুদিন লেগেছিল ।পরে জানতে পেরেছিলাম জিনিষ টি রান্না করতে পারলে আমার বিবাহিত জীবনের দুর্গম পথ কিছুটা হলেও সুগম হয়ে উঠবে। বুঝলাম “way to a man’s heart is through his stomach” গোছের একটি শিক্ষা আমাকে দেওয়া হচ্ছিল। মায়ের হাতের পোসতোর বড়া খাওয়া এক কথা আর পোসতোর সঙ্গে নিজের হাতেখড়ী ,এই দুটোতে যে কত পার্থক্য জেনেছিলাম তখন ! পোসতো বানাতে গেলে ঘরে কাঁচা পোসতো লাগে, আমার রান্নাঘরে সেইসময় এমন সৌখিন মশলা থাকত না । কোনো ব্যাপার না, মুদির দোকানে গিয়ে গম্ভীর মুখে দোকানি কে এক কিলো পোসতো দিতে বলেছিলাম। একটু বেশি করে কিনে রাখা ভাল, এমনই একটা মনভাব। দোকানি অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীর স্বরে আমায় পোসতোর দাম শুনিয়েছিলেন । দাম শুনে খানিকটা থমকে গিয়ে, এদিকে ওদিকে তাকিয়ে প্রায় ফিসফিস করে ছিলাম, ‘তাহলে একশো গ্রাম দিন’ । সেই পোসতো বাড়ি এনে পিষতে গিয়ে জল বেশি দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, পোসতো ডুবেছিল না আমি সে গল্পে কাজ নেই। বহু পরে জীবনের জ্ঞান চক্ষু খোলার পর দেখতে পেয়েছি, ” way to a man’s heart is a blind alley”. তবে তা নিয়ে দুঃখ নেই কারণ পোসতোর সঙ্গে এখন আমার বেশ মাখো মাখো একটা সম্পর্ক।
পুরানো কাসুনদি ঘেঁটে আর কাজ নেই। আমার যুগের গল্প তো প্রায় ত্রেতা যুগের সমসাময়িক । নতুন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরষে আর পোসতো হয়ে উঠেছে প্রেমিক আর প্রেমিকা, এবং তাঁদের জন্য নতুন মোড়কে নতুন ঘর করে দিয়েছ sunrise, এখন তাঁরা একইসাথে থাকেন। সত্যিই এখন প্যাকেট এর মুখ কেটে ঝুর ঝুর করে সরষে পোসতো পাওয়া যায়।আশাকরি আমার গল্পে পোসতো খসখস হয়ে ওঠেনি আর সরষের ঝাঁজে লেখা তেতো হয়নি। যাক তবু ছোট জায়ের আব্দার তো রাখলাম, তাতে করে আমার গল্পের গরু গাছে চড়ে না হয় একটু খিক খিক করে হাসলোই বা, নতুন বছরে প্রিয় মানুষের জন্যে একটি উপহার তো তৈরি হল । পাঠক বন্ধুদের যদি ভালো লেগে যায় সেটা হবে আমার উপরি পাওনা।