কালো জিরে কাঁচা লঙ্কা

আমার দিনগুলো যেন পুজো সংখ্যার গল্প, গড়িয়ে গড়িয়ে চলেছে নিজের গতিতে। দুটো দিনের মধ্যে পার্থক্য ক্রমে কমে আসছে, প্রত্যেকটি নতুন দিন যেন গত দিনের জলছবি। সকাল  বেলা নিয়ম করে বুবাই এর মা এসে কলিং বেল বাজিয়ে ঘুম ভাঙ্গায়। আমার ঘুম যদিও তার আগেই হালকা হয়ে আসে ,কিন্তু ভোরের বিছানার উষ্ণতার আরাম সহজে ছাড়তে মন চায় না । বুবাই এর মার নাম মালতী, কিন্তু সবাই তাকে বুবাই এর মা বলেই ডাকে, সে তাতেই বেশ খুশি । আমি তাকে বলেছি এতে তোমার নিজের এই সুন্দর নাম টা হারিয়ে যায় যদি, তাই আমি তোমায় মালতী নামেই ডাকব । আইডেন্টিটি হারিয়ে  যাবার  তেমন ভয় বোধহয় মালতীদের নেই । কিন্ত আমি আজও আইডেন্টিটি খুঁজে বেড়াই, কখনও একটি নামে, বা পুরোনো বই এর পাতায়, ঝড়ে পড়া শিউলি ফুলের বুকে,অমলতাস এর হাওয়ায় ভেসে আসা গানে, কিম্বা আমার মশলার বাক্সে।

নামের উপাখ্যান ছেড়ে এবার আমার কালো জিরে কাঁচা লঙ্কার গল্পে আসি। মালতীর হাতের এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি আর toast খেয়ে আমি চটজলদি রান্নাঘরে ঢুকি। ঢুকি বটে কিন্তু কী রাঁধব তার কূল কিনারা পাই না। মাছ, মুরগি, শাক সব্জি তে ভরা fridge টার দরজা খুলতেই  মনে হয় কেমন যেনো Colgate white হাসি ছড়িয়ে আমার  দিকে চেয়ে আমাকে challenge জানাচ্ছে, বলছে ‘দেখি তুই কি রান্না পারিস’।

এখানে একটু ব্যাক গিয়ারে গল্প টাকে নিতে হয়, নইলে তোমরা ভাবতেই পারো ‘এই মাঝ বয়সী মহিলার এমন দশা কেনো’। আসলে হয়েছে এই যে আমি দীর্ঘ কাল প্রবাসে ছিলাম। বহু কাল আগে কলেজে পড়ার সময়ে বিয়ে টিয়ে করে, একদম লোটাকম্বল নিয়ে এক Army man এর সাথে কলকাতা ছেড়ে ছিলাম। তারপর এই দীর্ঘ  তিরিশ বছরে ছুটি ছাটা ছারা কলকাতা ফেরা হয়ে ওঠেনি। ভারতের অনেক রাজ্যে ঘুরেছি, তাদের রান্না শিখেছি, রেঁধেছি, আর এই করতে করতে বাংলা মায়ের  হেঁসেলের থোর, বড়ি, মোচা, লাউ ডগা, কুমড়োর ছেঁচকী, এদের  ইতিহাস এর সাথে আমার পরিচয় ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে উঠেছে।

আমার এই প্রবাসী জীবনের গল্প টাকে ফরওয়ার্ড গিয়ার এ নিয়ে আসি এবার।গত কিছু মাস আগে Army man আর আমি কলকাতায় ফিরেছি ” ghar kab aaoge” এর টানে। আমার সাহেব গোছের Army man ,দেখছি রিটায়র করে কলকাতা এসে হটাৎ করে বেশ বাঙালি হয়ে উঠেছেন। রোজ ভোর সকালে তিনি সাহেবী কায়দায় সেজে গুজে golf খেলার পর বাড়ি  ফেরার পথে ঢোকেন বাঙালি বাবু দের বাজারে। দোকানিদের সাথে ইতিমধ্যেই তাঁর বেশ ভাব হয়েছে বুঝতে পারি বাজারের বহর দেখে। আজকাল দোকানিদের কথা মতই বাজার হয় আমাদের বাড়ির। থলে চড়ে ঘরে ঢোকে করমচা, কুমড়ো, উচ্ছে, কৎবেল, বড়ি, লকলকে পুই শাক, লাল শাক, আরো কত নতুন নতুন সব্জি । এমন অচেনা, অল্প চেনা, সবুজের অভিযান থেকেই  শুরু হয় আমার হেঁসেল শিল্পের challenge। এই challenge এর কারণেই  রান্নার লোক রাখার ব্যাপারে  আমার ঘোরতর আপত্তি। আমি সেই কবে থেকে রাজমা, ছোলে বটুরে , continental, chinese, সব শিখলাম আর আজ  কিনা থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর এর কাছে হার মেনে, তীরে এসে তরী ডোবাবো, কিছুতেই না। তাই রান্নাটা আমি নিজেই করি, আর মনে মনে নিজের পিঠ চাপড়ে বলি এই তো তুমি প্রবাসী থেকে বাঙালি হয়ে উঠছো।

ভাত খাওয়ার পর, যখন পশ্চিমের জানলার পাশে গিয়ে বসি, কোলের ওপর থাকে এই বছরের পুজোর দেশ পত্রিকা। অলস চোখে বই এর পাতা পাল্টাতে গিয়ে চোখ চলে যায় নিজের হলদে হয়ে যাওয়া ডান হাতের নখ গুলোতে। বাঙালির ঝোলে,জলে, স্বাদে, গন্ধে, ডুবছি আমি, রঙ লাগছে আঙুলে আর মনে। আর হ্যাঁ,বলা হয়নি, আমি ধীরে ধীরে ঘন্ট, ঝাল, ভাপা, সবটাই রাঁধছি, কিন্তু ঐ কালো জিরে আর কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে, তার বেশি লাগে না।  ঘরে ফিরে, অনেক  দিন গৃহ বন্দি থাকতে থাকতে বুঝেছি, জীবনের প্রয়োজন বড় কম, ঠিক ঐ comfort food এর মতন, কেবল কালো  জিরে আর কাঁচা লঙ্কা।

বহু বছর পর বাংলা হরফে কিছু  লিখলাম,  দোষ ত্রুটি পাঠক বন্ধু  নিজ গুনে ক্ষমা করে দেবেন আশা রাখি। আমার দিন, রাত্রি, রান্না, খাওয়া, বই, গল্প, আর আমি, সবটাই যেনো পূজো সংখ্যার পাতা থেকে  উঠে আসা সেই  পুরোনো আমি,যার কেবল চেনা ছিল কালো জিরে আর কাঁচা লঙ্কা। বাঙালি রান্না ঘরের আইডেন্টিটি ভেবে আঁকড়ে থেকেছি যাদের এত গুলো বছর, আমার সাধের কালো জিরে আর কাঁচা লঙ্কা।

4 thoughts on “কালো জিরে কাঁচা লঙ্কা

Leave a comment